,

ভারতের সিমলা যেন এক সুখের শহর


সেই ২০১৩ সালের এক শীতের রাতে এসেছিলাম সিমলায়। কিন্তু সেবার শহরটা আর দেখা হয়নি।পরদিন সকালেই আমাদের সোজা চলে যেতে হয়েছিল মানালি। এরপর আর সিমলায় যাওয়া হচ্ছিল না। শেষমেষ অনেক কিছু ব্যাটে বলে মিলিয়ে দুই মাস আগে হাজির হয়েছিলাম সিমলায়।

নানা জায়গায়, নানা কারণে ট্রেন লেট আর ট্রয় ট্রেনের সাত ঘণ্টা মিলিয়ে সিমলা পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর ৩টা। তড়িঘড়ি করে ফ্রেশ হয়ে হোটেল থেকে বের হলাম সিমলা দেখতে। মূল রাস্তা ধরে হেলেদুলে হাঁটা দিলাম। একটি শহরের ট্যুরিস্ট স্পটকে যে এভাবে বাসার বৈঠকখানার মতো করে সাজানো যায়, সেটা সিমলার মল রোড না দেখলে বোঝার কোনো উপায় নেই। এতটাই পরিপাটি করে সাজানো সব কিছু।

হোটেল থেকে বেরিয়ে পাহাড়ি পথ বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে চোখে পড়ল সাজানো-গোছানো, ঝকঝকে-তকতকে আর ঝলমলে সিমলা শহরটাকে।মনে হলো, ইংরেজ সাহেবরা যেভাবে রেখে গিয়েছিলেন, ঠিক সেভাবেই যেন শহরটা রয়ে গেছে! স্কুল-কলেজ, গির্জা, দোকানপাট, হোটেল-মোটেল, এমনকি ফুটপাথের দোকান পর্যন্ত সাজানো-গোছানো আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কোথাও এতটুকু ময়লা-আবর্জনা নেই। হাঁটছি আর তারিয়ে তারিয়ে সিমলার প্রতিটি মুহূর্ত প্রাণভরে উপভোগ করছি। সবুজ পাহাড়ে পাহাড়ে রঙিন প্রজাপতির মতো লেপটে আছে বর্ণিল সব ঘরবাড়ি। কোথাও কোথাও মেঘের দল লুকোচুরি করছে পাহাড় আর ঘরবাড়ির সঙ্গে। কোথাও কোথাও কালো মেঘ জমেছে বৃষ্টি হয়ে ঝরবে বলে আর দূরে আরেক দিকে ঝলমলে রোদ কোনো এক পাহাড়কে আলোকিত করে রেখেছে। যেন এক আলো-ছায়ার খেলা।

কত রকমের খাবারের সমারোহ যে আছে রাস্তার দুই পাশের মনকাড়া দোকানগুলোতে, চোখে ফেরানো দায়। জিবের জল শুকোনোর সময় পায় না, তার আগে চোখ পড়ে আরেকটা দোকানের সাজানো খাবারদাবারে। এসব দেখে কতই বা চুপ করে থাকা যায়। তাই তো প্রথমে এলো পিত্জা। তার দেখানো পথে একে একে এলো পেস্ট্রি, আইসক্রিম। এর পরও সাধ না মেটায়, শেষমেশ আপেল আর স্ট্রবেরির জুস নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম দোকান থেকে। আর বেশিক্ষণ এখানে থাকার ভরসা পাচ্ছিলাম না। ততক্ষণে সূর্যটা ক্লান্ত হয়ে ধীরে ধীরে পাহাড়ের কোলে হেলে পড়তে শুরু করেছে। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশটা যেন বিয়ের সাজে সেজে উঠতে শুরু করল। দিনের শেষ আলোটুকু উধাও হতেই মুহূর্তেই সিমলাও যেন তার রূপ পরিবর্তন করে ফেলল। চারদিকে লাল-নীল-হলুদ-সবুজ আলোর রোশনাই। এর মধ্যে দিয়েই হাঁটছি। দোকানগুলো নিয়ন আলো দিয়েই আপনাকে ডেকে নেবে ভেতরে। প্রসাধনী থেকে শুরু করে, খাবার এমনকি পানীয়র সব ব্র্যান্ড সেখানে সব সময় প্রস্তুত, শুধুই আপনার জন্য।

একটু এগিয়ে কয়েকটা দোকানে ঢু মারতেই আবার জিবে জল চলে এলো। এক দোকানে দেখলাম কড়াইয়ে গরম গরম গোলাপ জামুন তৈরি করা হচ্ছে! বিনা বাক্যে, ঝটপট দুটি গরম গরম গোলাপ জামুন খেয়ে নিলাম! একটু কেটে মুখে দিতেই নিজের অজান্তে চোখ দুটি বন্ধ হয়ে গেল! আহ কী স্বাদ! যতক্ষণ মুখে গোলাপ জামুন ছিল, চারপাশটা ততক্ষণ ছিল নীরব আর স্থির!

খাওয়া শেষে ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে বসলাম মেঘে-কুয়াশায় মাখামাখি এক জায়গায়, নিয়ন আলোর মাঝে, ঝকঝকে পাথরের বেদিতে। ক্ষণে ক্ষণে ঠাণ্ডা হিমশীতল বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে। এক ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল মন।

সেখানে কিছুক্ষণ বসে থেকে আবার ধীরে ধীরে উঠতে লাগলাম। ওখানকার একদম চূড়ায় একটা গির্জা আছে। সেখানকার রাস্তা বেশ প্রশস্ত। এতটাই যে কেউ ফুটবল, কেউ ক্রিকেট, কেউ ভলিবল, কেউ স্কেটিং করছে অনায়াসে। শত শত নারী-পুরুষ আর শিশু আয়েশ করে সময় কাটাচ্ছে নিজেদের মতো করে। দারুণ ঝলমলে রঙে সেজে আছে চারপাশটা। যেদিকেই তাকাই, সেদিকেই যেন সুখ আর আনন্দ! সিমলা যেন এক সুখের শহর। বেশ খানিকটা সময় সেখানে নিজেদের মতো করে কাটিয়ে ধরলাম হোটেলে ফেরার পথ।

পরদিন সকালে মানালি যাওয়ার গাড়ি খুঁজতে বেরিয়েছিলাম হেঁটেই। এই সুযোগে দেখে নিতে পেরেছি সিমলার বাজার, বাসস্ট্যান্ড আর শহরের বেশ কিছু অংশ। হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলাম এক গ্রিনভ্যালিতে। যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ পাহাড়ের সিঁড়ি। আরেকটু এগিয়ে গেলেই কুফরি! সিমলার একটি অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ, যেখানে আছে ঘোড়ায় চড়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দূরের শ্বেতশুভ্র পাহাড় উপভোগের আয়োজন। এই আয়োজনটুকু না হয় তোলা থাকুক ভবিষ্যতের জন্য।

কিভাবে যাবেন

সবচেয়ে সহজ আর কম খরচে সিমলা যাওয়ার উপায় হলো ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে কলকাতা। ওখান থেকে ট্রেনে দিল্লি। এরপর দিল্লি থেকে বাসে বা জিপে (গ্রুপ হলে) করে সিমলা। আবার ঢাকা বা কলকাতা থেকে দিল্লি পর্যন্ত বিমানে গিয়েও বাকি পথ বাস বা জিপে যেতে পারেন

 

     এ ক্যটাগরীর আরো সংবাদ