,

ফলের নামে বিষ খাচ্ছি –এম. মনসুর আলী

 

এখন ফলের মৌসুম। বাজারে গেলেই দেখা যায় আম, জাম, কাঁঠাল, আনারস, লিচু, বেল,তরমুজ ও কলাসহ নানা রকম ফল কিনে মানুষ হাসিমুখে বাড়ি যাচ্ছেন। লিচু বিক্রেতা মুঠে লিচুর আটি নিয়ে পাশে দিয়ে যাওয়া মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলছেন -” নেন ভাই মজাদার সুন্দর লিচু”। লিচু বিক্রেতার হাক-ডাক শুনে  ছোট জাহিদের কণ্ঠে গাওয়া  -“মধু হই হই বিষ হাওয়াইলা ” গানটির কথা মনে পড়ে যায়। এই লিচু দেখতে সুন্দর, খেতে মজাদার  হলে কি হবে। এই লাল মন ভুলানো রঙ্গের লিচু তো বিষ দিয়ে পাকানো! অধিক মুনাফার লোভে অসাধু ব্যবসায়ীরা কাঁচা ফলই ক্ষতিকারক রাসায়নিক দিয়ে পাকিয়ে বাজারে নিয়ে আগাম আসেন।

কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে ফলের নামে আমরা বিষ কিনে খাওয়াচ্ছি আমাদের পরিবার পরিজনদের। ব্যাগ ভরে বাসায় আম,লিচু নিলেই বউ খুশি। ভাই, বউকে বুঝান খুশি হওয়ার কিছু নেই। আজ পত্রিকার একটা লেখা পড়ে জানলাম এই সব ফলে শুধু বিষ আর বিষ। টাকা দিয়ে বিষ কিনে এনেছি। আম, লিচু,কাঁঠাল, আনারস,কলা বাজারে এমন কোন ফল নেই যাতে বিষ মেশায় না অসাধু ব্যবসায়ীরা। বউকে এও বলেন, এই সব বিষফল খেলে গ্যাস্ট্রিক আলসার, হৃদরোগ, হাপানী, মরণব্যাধী ক্যান্সারসহ নানা ধরনের জটিল রোগ হতে পারে। আপনার মুখ থেকে এই সব কথা শুনে বউ একদিন বলবে-“টাকা দিয়ে এই বিষফল আর এনো না।অসময়ে কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো ফল আর খাবোনা”।

আমাদের প্রিয় ফল আম।দুধ-ভাতে পাকা আম মিশিয়ে খেলে কত স্বাদ!  আমার বাবা এখনও শত বছর বয়সে আম-দুধের ভাত পছন্দ করেন।প্রিয় ফল আমের পঁচন রোধে এবং আমকে পাকাতে আমে দেয়া হচ্ছে -সায়ানাইড, ফরমালিনসহ নানা ধরনের কেমিক্যাল।গাছে মুকুল আসার পর থেকে শুরু করে আম পাকা পর্যন্ত বাগানে,আড়তে, দোকানে দফায় দফায় দেয়া হচ্ছে এই সব কেমিক্যাল। বিষাক্ত কেমিক্যালে ভরা এই আম খাওয়া আর বিষ খাওয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।যুক্তিবিদ্যায় আছে না?  –গরু ঘাস খায়।মানুষ গরু খায়। সুতরাং মানুষ ঘাস খায়। তাহলে দাঁড়ালো আম বিষ খাচ্ছে।আমরা আম খাচ্ছি।মানে আমরা  জেনেশুনে বিষ পান করছি।

বাজারে ৯৫ ভাগ আমের মধ্যেই সায়ানাইড ও ফরমালিন নামের  বিষাক্ত কেমিক্যাল রয়েছে। পত্রিকার পাতা খুললেই দেখি মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে টনে টনে এই কেমিক্যাল যুক্ত আম রাস্তায় ফেলে  ধ্বংস করছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানা করছেন।গত ২৮ মে রোববার দুপুরে আমার নিজ জেলা  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পৌর শহরের জগৎ বাজারে মেসার্স সুরমা ফলের আড়তকে কেমিক্যাল মিশিয়ে আম পাকানোর দায়ে আড়তের মালিক জাকির মিয়াকে ভোক্তা অধিকার আইনে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমান আদালত। এ সময় ৪৪০ কেজি আম ট্রাকের নিচে ফেলে ধ্বংস করা হয়। সায়ানাইড ও ফরমালিন এই দুটি কেমিক্যালে মানবদেহে মরণব্যাধি ক্যান্সার হওয়ার আশংকা শতভাগ। দেশে ক্যান্সার রোগ আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে বিষাক্ত আমই দায়ী।

এখন বলি লিচুর কথা। কাঁচা লিচুকে টকটকে লাল করতে,পঁচন রোধ করতে এবং পোকা ধরা বন্ধ করতে  পানির সঙ্গে ক্যামোমেথ্রিন ও টিডো নামের দুই ধরনের কীটনাশক ও ম্যাগনল নামের এক প্রকার হরমোন মিশিয়ে  লিচু গাছে ছিটানো হয়। রং ধরার পর লিচু দ্রুত বড় করতে ফের টিডো ও ম্যাগনল ছিটানো হয় গাছে!ক্যামোমেথ্রিন ও টিডো মিশানো এই লিচু খেলে কিডনি ও যকৃত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

কেউ কেউ নিশ্চয় পত্রিকায় পড়েছেন  ২০১২ সালে বাংলাদেশের  দিনাজপুর জেলায় লিচু খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে ১৪ শিশু, এদের মধ্যে ১৩ জনেরই মৃত্যু হয়।

মানব দেহে আয়রনের ঘাটতি পূরণ করে কলা। কলাকে  দ্রুত পাকানোর জন্য ভাইরাস তাড়ানোর নাম করে কলা চাষীরা স্প্রের মাধ্যমে মার্শাল, হিলডন, রাইজার, বাসুডিনসহ আরও অনেক ধরনের ওষুধ ছিটান কাঁচা কলায়।তাছাড়া কলাকে  সুন্দর আর স্পটমুক্ত করতেও ব্যবহার করা হয় নানা ধরনের রাসায়নিক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রাসায়নিক মিশানো কলা খাওয়ার ফলে পাকস্থলীতে এসিডের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। পাকস্থলীতে যদি কোনো ক্ষত থাকে সেটি আরও বেড়ে যায়।

আনারসের কথা শুনলেই জ্বিবে পানি এসে যায়।ছোট বেলায় আনারসকে ছোট ছেট চাক করে লবন মরিচ মিশিয়ে খেতাম। কতই না স্বাদ লাগতো! এখনও খেতে মন চাই। কিন্তু কেমিক্যালের ভয়ে খাইনা। আনারস প্রাকৃতিকভাবে খাবার উপযোগী হতে সময় লাগে তিন মাস। কিন্তু লোভী চাষীরা বিভিন্ন রাসায়নিক ছিটিয়ে দুই মাসের মধ্যে আনারসকে খাবার উপযোগী করে তুলেন। ইথাইলিন বা ক্যালসিয়াম কার্বাইড প্রয়োগের কারণে ২-৪ দিনের মধ্যেই ফল হলুদ রং ধারণ করে। আর ফল পাকাতে যে বিপজ্জনক রাসায়নিক পর্দাথটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় তার নাম কার্বাইড। সবশেষে স্প্রে করা হয় ফরমালিনএতে অসময়ে পাকানো আনারস পচনের হাত থেকে রক্ষা পায়। এভাবেই আনারসেও মেশানো হচ্ছে বিষ।

সব মানুষই কমবেশি তরমুজ খেতে পছন্দ করেন। রসালো ও সুস্বাদু ফল তরমুজ। আমি জানতাম তরমুজ কেমিক্যাল মুক্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয় তরমুজেও বিষ!! তরমুজকে পাকা এবং লাল দেখানোর জন্য মেশান হচ্ছে বিপজ্জনক লাল রং ও মিষ্টি স্যাকারিন। ইনজেকশনের সিরিঞ্জের মাধ্যমে তরমুজের বোঁটা দিয়ে এসব দ্রব্য পুশ করে তরমুজ পাকা ও লাল টকটকে বলে বিক্রি হচ্ছে। ক্ষতিকারক দ্রব্য মেশান এ ধরনের তরমুজ খেয়ে আমাদের পাশের ইউনিয়ন পানিশ্বরে অসুস্থ হচেছে এক পরিবারের ৭ জন।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব রাসায়নিক পদার্থের কারণে মহিলারা বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম দিতে পারেন। শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া রাসায়নিক মেশানোর কারণে ফলের পুষ্টি ও স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।

খেজুর আমার পছন্দ। ভাছিলাম খেজুর শতভাগ বিষমুক্ত।ইন্টারনেট জগত ঘুরে দেখলাম খেজুরেও দেওয়া হচ্ছে কেমিক্যাল। ঢাকা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাহিদ রসুল বলেন, পচার হাত থেকে রক্ষা করতে খেজুরে এক ধরনের কেমিক্যাল দেওয়া হয়। আমরা রোজার সময় অভিযান চালিয়ে এর প্রমাণ পেয়েছি(১৪ জুন, ২০১৭,কালেরকন্ঠ)। গত কয়েক বছর আগে বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খেজুরের ৩০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, সব পরীক্ষায় ফরমালিনের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। এসব তথ্য  থেকে বুঝা যাচ্ছে ফরমালিন ছাড়া বাজারে কোনো খেজুর নেই।

আমাদের স্থানীয় বাজার অরুয়াইলে সরেজমিনে ঘুরে দেখলাম  বস্তায় বস্তায় পড়ে আছে খেজুর। কোনো কোনো দোকানে  খেজুরকে চকচকে করার জন্য তাতে তেল জাতীয় কি মেশানো হচ্ছে।

সুপ্রিয় পাঠক সরকারের একার পক্ষে এই পুষ্টি  সমৃদ্ধ মৌসুমি ফলকে ভেজালমুক্ত করা সম্ভব নয়।দেশটা আমাদের সকলের। আমাদেরও দায়িত্ব আছে।আসুন আমরা সচেতন হয়।অসাধু, ভেজাল ব্যবসায়ীদের বিরোদ্ধে মাঠে নেমে আন্দোলন করি।

 

     এ ক্যটাগরীর আরো সংবাদ