,

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে কে পাচ্ছেন ধানের শীষের টিকেট ?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক : ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদীদল বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ পূরণ করে জমা দিয়েছেন দলের ১০ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতা। তারা হলেন–-বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, বিএনপির কে›ন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ মোহাম্মদ শামীম, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এস.এন তরুন দে, আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু আসিফ আহমেদ, সরাইল উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এডভোকেট আব্দুর রহমান, সরাইল উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ড. আজিজ আহমেদ, সাবেক ছাত্রদল নেতা আহসান উদ্দিন শিপন এবং জাবেদ আল হাসান স্বাধীন।
এদিকে বিএনপি নেতৃত্বাদীন ২৩দলীয় জোটের মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছে শরীকদল জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল-হাবীবও।
তবে শেষ পর্যন্ত কে পাচ্ছেন ধানের শীষের টিকেট ?-এনিয়ে চলছে নানান জল্পনা-কল্পনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা করছেন নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে হিসাব-নিকাশ।
উল্লেখ্য যে, সরাইল ও আশুগঞ্জ দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন। এই নির্বাচনী এলাকার দুই উপজেলার রয়েছে মোট ১৭টি ইউনিয়ন। এর মধ্যে আশুগঞ্জ উপজেলায় ৮টি এবং বাকী ৯টি ইউনিয়ন সরাইল উপজেলায় অবস্থিত। তবে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত আশুগঞ্জ উপজেলার মাত্র একটি ইউনিয়ন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ৫টি ও সরাইল উপজেলার ইউনিয়নগুলি নিয়ে গঠিত ছিল এই আসনটি। ১৯৭৩ সালের পর থেকে ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত আসনটি বিএনপির দখলে ছিল। তৎকালীন প্রতিটি নির্বাচনেই এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রার্থী চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া। অবশ^্য ২০০১ সালে ৪দলীয় জোট গঠনের প্রেক্ষিতে ওই বছর এ আসনে জোটর শরীকদল ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি ফজলুল হক আমিনী আওয়ামীলীগের প্রার্থী আব্দুল হালিমকে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে সরকার গঠনের সময় উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়াকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়।
পরবর্তীতে ১/১১ এর সময় আসনটি পূর্ণবিন্যাস করে সদর উপজেলার ৫টি আসন বাদ দিয়ে আশুগঞ্জ উপজেলার বাকী ৭টি ইউনিয়নও এর অর্ন্তভূক্ত করা হয়। এরপর রাজনৈতিক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে নতুনভাবে বিন্যস্ত আসনে ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে আবারো বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন মুফতি আমিনী। মহাজোট গঠনের প্রেক্ষিতে এতে আওয়ামীলীগও আর নিজ দলীয় প্রার্থী দিতে পারেনি। আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের মনোনয়ন নিয়ে এমপি নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির প্রার্থী এডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি জোট। আবারো মহজোটের মনোনয়ন নিয়ে এমপি হন জাতীয় পার্টির এডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা।
মূলত এমন প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখেই নানাভাবে বিশ্লেষণ করছে রাজনৈতিক চিন্তকগণ। দিন যত যাচ্ছে এতে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন সমীকরণ।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে হেভিওয়েট প্রার্থী চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া। তবে বার্ধ্যকজনিত কারণ ও ১/১১ এর পট পরিবর্তনের পর থেকে কিছু সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া ছাড়া দলের কোন কর্মসূচিতে তার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। দীর্ঘ অনুপস্থিতির ফলে দলের নবীন নেতাকর্মী ও নতুন প্রজন্মের ভোটারদের সাথে তার তেমন যোগাযোগ গড়ে উঠেনি। দলীয় মনোনয়ন পেলেও এক সময়ের জননন্দিত এ নেতা বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভোটের মাঠে প্রতিযোগিতার দৌড়ে কতটা সফল হবে? ভাবছেন দল ও জোটের অনেকেই।
অন্যদিকে বিএনপির হারনো দূর্গ পূণরুদ্ধারে জনসম্পৃক্ত কোন নতুন মুখের প্রয়োজন অনুভব করছেন কেউ কেউ। সে ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে আলোচনায় রয়েছে সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতা ও বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির কমিটির সদস্য শেখ মোহাম্মদ শামীম এর নাম। কেন্দ্রীয় ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্ব দেয়ার সুবাধে রাজধানী ঢাকার রাজপথের আন্দেলন সংগ্রামে তার অবদান সুবিদিত। গত কয়েক বছর যাবত তিনি নিয়মিত এলাকায় আসছেন ও নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে গণসংযোগ করছেন। মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকায় বিএনপি ও ২০দলীয় জোটের শরীক দলগুলির তৃণমূল কর্মী, সমর্থকদের সাথে তার সু-সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এছাড়া ইতোমধ্যেই নির্বাচনী এলাকার সর্বস্তরের জনগণের সাথেও ব্যাপক পরিচিত হবার পাশাপাশি একটি ভাল অবস্থান তৈরি হয়েছে এই তরুণ নেতার।
আলোচনায় আসছে বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতা এস এন তরুন দে’র নামও। রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে তার ভূমিকাও কম নয়। বিগত ৩ বছর ধরে বিএনপি তথা ২০দলীয় জোটের মনোনয়ন পেতে আশুগঞ্জ ও সরাইলে নিয়মিত গণসংযোগ করে আসছেন। ফলে সর্বস্তরের জনগণের সাথে ব্যাপক পরিচিতি ও সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে তরুন দের। অধিকন্তু তার মনোনয়ন হলে নির্বাচনী এলাকার উল্লেখযোগ্য পরিমান সংখ্যালগু হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটের প্রভাব ধানের শীষের অনুকুলে পরতে পারে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষকরা।
বিএনপির মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হবার পর নতুন করে আলোচনায় আসে বিএনপি কেন্দ্রীয় সহ আন্তর্জাতিক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার নাম। তিনি এই আসনের জন্য বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পত্র নেওয়ার পর তাকে নিয়ে আলোচনা চলছে পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ সংসদীয় আসন জুড়ে। ইতোপূর্বে এলাকায় তার তেমন আসা যাওয়া না থাকলেও গণমাধ্যমে সক্রিয় থাকার কারণে তিনি এমনিতেই অনেকটাই পরিচিত। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পক্ষে এবং ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে তার বক্তব্য দেশ-বিদেশে বেশ আলোচিত। ফলে কম দিনেই তিনি বিএনপির রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন । এছাড়া ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এ এলাকার এক সময়ের জননন্দিত নেতা ভাষা সৈনিক অলি আহাদ এর মেয়ে হওয়ায় ভোটের মাঠে এ আবেদন কাজে লাগতে পারে। এমন অভিমত অনেকের।
এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে আশুগঞ্জ ও সরাইলের উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবু আসিফ আহমেদ ও এডভোকেট আব্দুর রহমানকে নিয়েও চিন্তা করছেন অনেকে।
এদিকে ২৩দলীয় জোটের শরীক দল জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামও প্রার্থী দিতে চায় এ আসনে। দলের সহ সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল-হাবীব জোটের মনোনয়ন প্রত্যাশী। বিগত ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে তৎকালীন জোট প্রার্থী মুফতি ফজলুল হক আমিনীর (রহ.) চীফ ইলেকশন এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেচিলেন তিনি। জমিয়ত মনে করে সম্প্রতি কয়েকটি ইসলামী দলের নেতাদের আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় এখানকার ইসলামী মূল্যবোধের ভোটের উপর প্রভাব ফেলার চেষ্টা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জুনায়েদ আল-হাবীবের মতো একজন আলেমে দীনকে এ আসনে ২৩ দলীয় জোটের মনোনয়ন দেয়া হলে এ আসনসহ জেলার সবকটি আসনের ইসলামী মূল্যবোধে বিশ^াসী সেন্টিমেন্টকে বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করতে সহায়ক হবে। এছাড়া একজন ইসলামীক আলোচক হিসেবে এলাকার সর্বস্তরের মানুষের নিকট তার ব্যাপক পরিচিতি ও গ্রহনযোগ্যতাও রয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনয়ন নিয়ে এভাবেই বিশ্লেষণ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই আলোচনা-পর্যালোচনা লক্ষ্য করা যায় সাধারণ জনগণের মাঝেও। শেষ পর্যন্ত কে পাচ্ছেন এ আসনে ধানের শীষের টিকেট? -এ নিয়ে পাড়া মহল্লার স্টলগুলিতে চায়ের কাপে জমছে আলোচনার ঝড়।

     এ ক্যটাগরীর আরো সংবাদ