,

কবি নজরুল ইসলামের কাব্যে ঈদুল আযহার চেতনা

কবি নজরুল ইসলামের কাব্যে ঈদুল আযহার চেতনা
মনসুর আহমদ

আত্মত্যাগের ঈদ পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলমান জাতির কাছে বার বার এসে হাজির হয় কাল পরিক্রমায়। এ ঈদ মুসলমান সমাজে নিয়ে আসে ত্যাগের অনন্দ, জাগিয়ে তোলে ঐতিহ্য চেতনার উজ্জ্বল ভাস্বর অচেতনতার আঁধারে ঘেরা মুসলমানদের হৃদয়াকাশে। আজ হতে চার হাজার বছর আগে আল্লাহ্র হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণের পর তাঁর দুই বান্দা মাথা পেতে দিয়েছিলেন রবের কাছে তলোয়ারের নিচে। ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হয়ে তাঁরা আজও ঈমানের আলো জ্বালিয়ে চলছেন মুমিনের হৃদয় কুলে। এ ত্যাগের কাহিনী কোরআনে বর্ণিত হয়েছে অপূর্ব ভঙ্গিতে, যেন সত্যের আলোয় মানুষের হৃদয় কন্দর উদ্ভাসিত হয়, যেন আশেকে ইলাহীরা খোদাদ্রোহী তাগুতী ক্ষমতা দর্প চূর্ণ করার লক্ষ্যে কক্ষণই প্রাণ, প্রিয় দৌলত বিভব বিলিয়ে দিতে ভয় না পায়।
মুসলিম রেনেসাঁর কবি নজরুল ইসলাম এ কাহিনীকে দেখেছেন আল্লাহর পথে সৈনিকের চোখ দিয়ে। তাঁর তপ্ত মানস ভূমিতে এ কাহিনী মুসলিম ঐতিহ্য চেতনার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। বাংলা কাব্যে মুসলিম ঐতিহ্যের রূপায়ণে তাঁর প্রায়াস ও সার্থকতা সবার ঊর্ধ্বে। মুসলিম ঐতিহ্যের রূপকার হিসেবে তাঁর ধর্মীয় ও ইতিহাস সচেতনতা উজ্জ্বল ভাবে তাঁর রচনায় চিত্রিত হয়েছে। ঈদুল আজহার ঐতিহ্য চেতনা কবির কাব্য ধারায় নব জীবনের জোয়ার এনেছে।
কোরবানির ঐতিহাসিক ঘোষণা-“আমি সকল দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ইবরাহীমের তরীকার উপরে একনিষ্ঠ হয়ে ঐ আল্লাহর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছি যিন আসমানও জমীন পয়দা করেছেন এবং আমি কখনও শিরক কারীদের মধ্যে নই। আমার নামাজ, আমার কোরবানি আমার জীবন আমার মরণ একমাত্র আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের জন্য, তাঁর কোন শরীক নেই। এই নির্দেশই আমাকে দেয়া হয়েছে, এবং আমি, আনুগত্যশীলদের মধ্যে এক জন।” এ ভাষণ প্রতিফলিত হয়েছে নজরুলের কাব্যে। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা এবং ৫নং ম্যাঙ্গোলেন এবং দৈনিক ‘কৃষক’ পত্রিকার অফিস গৃহে জনসাহিত্য সংসদের শুভ উদ্ভোধনে প্রদত্ত অভিভাষণে তিনি বলেন, “কওমের সত্যিকার কল্যাণ করতে হলে ত্যাগ করতে হবে হজরত ইবরাহীমর মতো।
দু’দিন পরে কোরবানী ঈদ আসছে। ঈদের নামাজ আমাদের শিখিয়েছে, সত্যিকার কোরবানী করলেই মিলবে নিত্যানন্দ। আমরা গরু ছাগল কোরবানী করে খোদাকে ফাঁকি দেবার চেষ্টা করছি। তাতে করে আমরা নিজেদেরকেই ফাঁকি দিচ্ছি। আমাদের মনের ভিতরে যে সব পাপ, অন্যায়, সার্থপরতা ও কুসংস্কারের গরু ছাগল- যা আমাদের সৎ প্রবৃত্তির ঘাস খেয়ে আমাদের মনকে মরুভূমি করে ফেলেছে আসলে কোরবানী করতে হবে সেই সব গরু ছাগলের। হজরত ইবরাহীম নিজের প্রাণতুল্য পুত্রকে কোরবানী করেছেন বলেই তিনি নিত্যানন্দের অধিকারী হয়েছিলেন। আমরা তা করিনি বলেই আমরা কোরবানী শেষ করেই চিড়িয়া খানায় যাই তামাসা দেখতে। আমি বলি, ঈদ করে যারা চিড়িয়া খানায় যায় তারা চিড়িয়া খানায় থেকে যা না কেন?”
কবি আত্মমুক্তি ও স্বাধীন চিত্ততার জাগরণের সুর শুনতে পেয়েছেন ঈদের আনন্দ কলধ্বনীতে। ঈদুল আজহা পশু কোরবানীই নয়, বরং সর্বত্যাগের শিক্ষা নিয়ে হাজির হয় এ সত্য অনুভব করেছিলেন, তাই তিনি ১৩৪৭ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির ঈদ সম্মেলনের অভিভাষণে বলেছিলেন, “আমি আপনাদেরকে ‘ঈদ মোবারক হো ’বলে প্রথমেই অভিনন্দিত করছি। ঈদের উৎসব আনন্দের উৎসব, ত্যাগের উৎসব, আল্লাহ্র রাহে সব কিছু কোরবানী করার ইঙ্গিতই এই উৎসব বয়ে এনেছে। কোরআনের ছুরে বকরায় এই কোরবানীর কথা রয়েছে, এবং সূরা নূরের ভিতরে উল্লেখিত জয়তুন ও রওগণের যে সব কথা রয়েছে, তার অর্থ সকলকে আমি অনুধাবন করতে অনুরোধ জানাচ্ছি। কোরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহর নামে সকল ঐশ্বর্য সকল সম্পদ কোরবানী করতে হবে। একটা গরু কোরবানী করেই সবকে ফাঁকি দেওয়া যেতে পারে কিন্তু আল্লাহ্কে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়।
সকল ঐশ্বর্য, সকল বিভূতি আল্লাহ্র রাহে বিলিয়ে দিতে হবে। জগতের আর কোন ধর্ম এত বড় শিক্ষা মানুষের জন্য নিয়ে আসেনি। ঈদের শিক্ষার ইহাই সত্যিকার অর্থ।”
জাতির শ্রেষ্ঠ শক্তিমান সন্তানদেরকে বদর ওহোদের চেতনায় উজ্জীবিত করার, আত্মত্যাগের মূলমন্ত্র কবি খুঁজে পেয়েছেন কোরবানীর ঈদের মূল ঘোষণার মধ্যে। তিনি তাই বলেছেন, “আমি গেয়েছি এই শহীদদের জয়গাথা! তাঁদের জন্য আজও আমি লুকিয়ে কাঁদি। আল্লাহর রহমত পেয়েও তাঁদের কথা -তাদের ত্যাগ মনে পড়লে আমি চিৎকার করে কাঁদি। যে নিত্য শান্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছি, সেই শান্তির অটল আসন আমার টলতে থাকে।
আমি জানি, তোমাদের মাঝে বহু তরুণ আছেন- যাঁদের রুহ আত্মা জাগ্রত। যারা বাইরের সম্মান লোভ খ্যাতি সব কিছু বিসর্জন দিয়ে রাহে লিল্লাহ্ আপনাকে সদ্কা দিতে রাজী আছেন- আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করি তাঁরা কি গ্রহণ করবেন না এই মহা মন্ত্র- “ইন্না সালাতি নুসুকী ওয়া মাহয়্যায়া ওয়া মমাতি লিল্লাহে রব্বিল আলামীন।”- “আমার সব প্রার্থনা, নামাজ রোজা তপস্যা জীবন -মরণ সব কিছু বিশ্বের একমাত্র পরম প্রভু আল্লাহ্র পবিত্র নামে নিবেদিত।
যে মনে মোনাফেকিতে ভরা সে পারে না জাতিকে এমন আহ্বান জানাতে। কবির হৃদয়ে আরাফাতের ময়দানের তাকবীর ধ্বনিতে হয়ে ছিল বলেই তিনি এমন আহ্বান জানাতে পারলেন খালেদ তারেক- মুসার অনুসারীদেরকে।
নজরুলের ঈদুল আজহা সম্পর্কিত কবিতায় ঐতিহাসিক বোধ ও কাল চেতনার চেয়ে ইসলামী আদর্শ উজ্জীবনের চেতনা অধিকতর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। নজরুলের পূর্বে কবি কায়কোবাদ, ইসমাইল হোসেন শিরাজী, মোজাম্মেলহক প্রমুখ কবির লেখায় দেখা যায় ঈদুল আজহাকে আত্মকোরবাণীর প্রতীক রূপে। তবে নজরুল হৃদয়ে যে অফুরন্ত আবেগ নিয়ে ঘুমন্ত মুসলিম জাতিকে জাগাতে কোরবানির কবিতায় ভাব ও শব্দের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন এমন সার্থক ধ্বনি আর কারও কবিতায় দেখা যায় না।
তিনি এ যুগের ভীরু মুসলমানদের চরিত্র দেখে ব্যথিত হয়েছেন। বাহ্যিক আচার আচরণ যে আল্লাহ্র কাছে গ্রহণীয় নয়, যারা জান্নাত দাও, জান্নাত দাও বলে দিন পাঁচবার প্রার্থনা করে কিন্তু আল্লাহর রাহে মরণ বরণে ভয় পায় এমন মুসলমানকে ইব্রাহীমের শিক্ষা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন ‘বকরীদ’ কবিতায়। তিনি লিখেছেন-
“ইবরাহীমের কাহিনী শুনেছ? ইসমাইলের ত্যাগ?
আল্লারে পাবে মনে কর কোরবানী দিয়ে গরু ছাগ?
আল্লার নামে, ধর্মের নামে মানব জাতির লাগি
পুত্রেরে কোরবানী দিতে পারে, আছে কেউ হেন ত্যাগী?
সেই মসুলিম থাকে যদি কেউ, তসলিম করি তারে,
ঈদগাহে গিয়া তারি সার্থক হয় ডাকা আল্লারে।
অন্তরে ভোগী বাইরে সে যোগী, মুসলমান সে নয়,
চোগা চাপকানে ঢাকা পড়িবে না সত্য সে পরিচয়!”

কবি নজরুল ইসলাম কোরবানিকে দেখেছেন মুসলমান হৃদয়ের অনন্ত শক্তির পুণ্যাধার রূপে। নমরূদের অগ্নিকুণ্ড থেকে জাতিকে বাঁচাবার জন্য যেমনি খোদার খলিল অনল কুণ্ডে ঝাঁপ দিয়োছিলেন, যেমনি নবী আল্লাহ্র ইচ্ছার সামনে প্রাণপ্রিয় পুত্রকে কোরবানি দিতে এগিয়ে এলেন তেমনি আজকের মুসলমানও যেন হৃদয়ের তপ্ত খুন আল্লাহ্র রাহে ঢেলে দিয়ে মানুষের সত্য মুক্তি, স্বাধীনতা সুখ বিলাতে পারে এটাই কবির কামনা। কোরবানি উৎসব শুধুমাত্র পশুর খুন বইয়ে দিয়ে মুসলমানের ভূরি ভোজনের উৎসব নয়, বরং এ উৎসব অন্তরে প্রচণ্ড শক্তি অর্জনের আয়োজন। এ কথাই কবি নজরুল জানিয়ে দিয়েছেন তাঁর ‘কোরবানী ’কবিতায়। তিনি লিখলেন:

“ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ ’ শক্তির উদ্বোধন
মুসলিম রণ ডঙ্কা- সে,
খুন দেখে করে শঙ্কা কে ?
টঙ্কারে অসি- ঝঙ্কারে,
ওরে হুঙ্কারে, ভাঙি’ গড় ভীম কারা লড়বো রণ-মরণ!
তালে বাজবে ঝন্ ঝন্ ।
ওরে সত্য মুক্তি, স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন -মোচন ।
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন।”

মানুষের মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তুলতে হৃদয়কে শক্তিশালী করতে তার ভিতরকার পশুত্বকে কোরবানি করতে হবে। যখন পাশবিকতার হিংস্রতা জগৎ থেকে বিদায় নেবে তখনই মানুষ লাভ করতে পারেবে পূর্ণ আজাদীর স্বাদ। পূর্ণ আজাদীর স্বাদ লাভ করতে হলে একমাত্র আল্লাহতেই আত্মসমর্পণ করতে হবে। তাইতো মুসলমান পশুর গলায় ছুরি চালায় আর ঘোষণা দেয়, “নিশ্চয়ই আমার নামাজ,আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ একমাত্র আল্লাহর জন্য।” আল্লাহর পাথে জীবন দেওয়ার ওয়াদা শহিদ হওয়ার পবিত্র ওয়াদা নিয়ে আমাদের সামনে যে ঈদ হাজির হয় তা শহীদি ঈদ। কবি তাইতো এ ঈদকে কোরবানী বকরীদ-ই নয় বরং শহীদি ঈদ রূপে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি শহীদি ঈদ” কবিতায় লিখলেন,

শহীদের ঈদ এসেছে আজ,
শিরোপরি খুন লোহিত তাজ,
আল্লাহ্র রাহে চাহে সে ভিখ্
জিয়ারার চেয়ে পিয়ারা যে
আল্লাহ্র রাহে তাহারে দে
চাহি না ফাঁকির মনি মানিক।
… .. .. … …

ডুবে ইসলাম আসে আঁধার
ইবরাহীমের মতো আবার
কোরবানী দাও প্রিয় বিভব!
জবীহুল্লাহ ছেলেরা হোক,
যাক সব কিছু সত্য রোক!
মা হাজেরা হোক মায়েরা সব।

কবি শুধু মাত্র মুসলমান পুরুষদেরকেই সংগ্রামে শক্তি উদ্বোধন আহ্বান জানাননি। একটি জাতির মুক্তি ও তরক্কী নির্ভর করে পুরুষের পাশাপাশি নারী সমাজের কোরবানির উপর। নারী যদি একদল সিংহপুরুষ অমিত তেজী পুত চরিত্রের সন্তান উপহার দিতে পারে তা হলেই জাতি পাবে তাদের মাধ্যমে শান্তি ও মুক্তি। এর বাস্তব উদাহরণ রেখে গেলেন মহীয়সী নারী হজরত হাজেরা আল্লাহ্র রাহে প্রাণ প্রিয় সন্তানকে কোরবানির উদ্দেশ্যে পেশ করে। তার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে হজরত আসমা বিনতে আবুবকর (রাঃ) ও আরো কয়েক মহিলা সাহাবী তাঁদের পুত্রদেরকে পাঠালেন জিহাদে অসত্য ও অন্যায়বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শহীদি পুত বসনে সাজিয়ে দিয়ে। মুসলমানদের পবিত্র জীব কোরবানির উৎসব শহীদি উৎসবেরই আয়োজন, এই সত্য তুলে ধরেছেন কবি তাঁর কোরবানী কবিতায়, যেখানে উল্লিখিত হয়েছে হজরত হাজেরার মহান ত্যাগের ইতিহাস মুসলমান নারীর চেতনার উৎস রূপে। কবি দরদ ভরা অন্তরে লিখলেন:-

এত নহে লোহু তরবারের
ঘাতক জালিম জোরবারের
কোরবানের জোর-জানের
খুন এ যে, এতে গোর্দা ঢের রে এ ত্যাগে ‘বুদ্ধ’ মন!
এতে মা রাখে পুত্র পণ।
তাই জননী হাজেরা বেটারে পরালো বলির পূত বসন!
পিতার হাতে পুত্র সন্তানের হত্যার লেখা আছে শাহ্ নামায়। যা পাঠ করে সাহিত্যানুরাগীরা আজও অবচেতন ভাবে চোখের পানি ফেলে। কিন্তু ইবরাহীমের হাতে পুত্র ইসমাইলের কোরবানীর আয়োজনের ইতিহাস চোখে অশ্রু নয় বরং অন্তরে শহীদি জজবা পয়দা করে যুগে যুগে। শহীদি ঈদকে কবি যে দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে দেখেছেন তা একজন কবির দেখাই নয়, বরং প্রেমময় আল্লাহ্তে আত্মসমর্পণ কারী একজন পরম পুরুষের দেখা।
কবি নজরুলের হৃদয়ে ঈদুল আজহা যে ঈমানী চেতনা পয়দা করেছিল তার তরাঙ্গাঘাতে কবি মুসলিম জাতিকে জাগাবার আহ্বান জানালেন-

“দিকে দিকে পুনঃ জ্বলিয়া উঠেছে
দীন-ই ইসলামী লাল মশাল
ওরে বেখবর তুইওঠ জেগে
তুই তোর প্রাণে প্রদীপ জ্বাল।

তিনি খোদার দরগাহে প্রার্থনা জানালেন:-

“তওফিক দাও খোদা ইসলামের
মুসলিম জাহাঁ পুনঃ হোক আবাদ।”

বর্তমান বিশ্বে ইসলামের শান্তি ও কল্যাণের রূপ ফুটিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজন হজরত ইবরাহীম ও হজরত ইসমাইলের ন্যায় আল্লাহ্র কাছে আত্মসমর্পণ কারী ব্যক্তিত্বের। কবি এ সত্য উপলব্ধি করেছেন তার অন্তর তলে। তাই ‘কৃষকের ঈদ’ কবিতায় তাঁকে বলতে শুনি:-

“কোথা সে শক্তি – সিদ্ধ ইমাম, প্রতি পদাঘাতে যার
আবে- জম জম শক্তি উৎস- বাহিরায় অনিবার?
আপনি শক্তি লভেনি যে জন, হায় সে শক্তিহীন
হয়েছে ইমাম, তাহারি খোৎবা শুনিতেছি নিশিদিন।
দীন কাঙালের ঘরে ঘরে আজ দেবে যে নব তাগিদ
কোথা সে মহান শক্তি- সাধক আনিবে যে পুনঃঈদ।”

কবির কবিতা, ভাষণে যেমন শহীদি ঈদের শিক্ষা ফুটে উঠেছে তেমনি তাঁর গানেও ঈদের চেতনা আশ্রয় নিয়ে ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তুলেছে। তাঁর ‘বাজল কি রে ভোরের সানাই নিঁদ মহলার আঁধার পুরে ’জাগরণী মূলক গান হযরত ইবরাহীম- ইসমাইল স্মৃতি বিজড়িত কাবার পবিত্র ছবি সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। গানটির কয়েকটি পঙ্ক্তি:-

আজকে আবার কাবার পথে
ভিড় জমেছে প্রভাত হতে।
নামল কি ফের হাজার স্রোতে
হেরার জ্যোতি জগৎ জুড়ে।।
তীর্থ পথিক দেশ বিদেশের
আরাফাতে আজ জুটল কি ফের
‘লা-শরীক আল্লাহ’ মন্ত্রের
নামল কি বান পাহাড় ‘তুরে।’

নজরুল ইসলাম তাঁর সহজাত প্রবণতার কল্যাণেই মুসলিম ইতিহাস ঐতিহ্যের দ্বারস্থ হয়ে ছিলেন। ইসলামের এই ঐতিহ্য সম্পদকে আত্মস্থ করে একটি নতুন দৃষ্টিকোন তৈরী করতে তিনি সমর্থ হয়েছিলেন। অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায়, “সমগ্র জাতির উত্তরাধিকারকে মনের মধ্যে গ্রহণ করতে পারলে তবে মহাকাব্য অথবা মহাকবি সুলভ কাব্য রচনা সম্ভব হয়। দেশের এবং জাতির মনের সঙ্গে কবির অন্তরঙ্গ পরিচয় প্রয়োজন। কাব্য রচনায় কবির একান্ত নিজস্ব মনের (চড়বঃং ঢ়ৎরাধঃব সরহফ) চাইতে দেশাশ্রিত মন (ঃযব সরহফ ড়ভ ঃযব পড়ঁহঃৎু) অনেক বড় কথা – এই কথাটির প্রতি টিএইচ, এলিয়ট বিশেষ ভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বলা বাহুল্য উত্তরাধিকারকে অন্ধভাবে গ্রহণ করার মধ্যে কোন কৃতিত্ব নাই। কিন্তু কবির মনতো নিষ্ক্রয় মন নয়, সৃজনশীল মন। তিনি যাকে পেলেন তাকে নতুন করে ঢেলে সাজিয়ে নেন- মাইকেল যেমন নিয়ে ছিলেন রামায়ণের কাহিনীকে।”
কবি নজরুলের রচনায় মুসলিম ইতিহাস- ঐতিহ্য তাঁর নতুন করে ঢেলে সাজিয়ে নেবার ক্ষমতায়- সমকালীন মুসলিম জীবনের দুর্গতি মোচনের অনন্য উপায় হয়েছে। ঈদুল আজহা আজ তাই মুসলিম জীবনে শহীদি চেতনার উৎস।

     এ ক্যটাগরীর আরো সংবাদ