,

ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হজ্ব ও কুরবানি

ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হজ্ব ও কুরবানি
সায়্যিদ মুয্যাম্মিল

আরবি ‘ঈদ’ শব্দের অর্থ আনন্দ, খুশি, বার বার ফিরে আসা, ঘুরে ফিরে আসা, জমায়েত হওয়া, অভ্যাস ইত্যাদি। যেহেতু দিনটি বার বার ফিরে আসে এবং মুসলমানরা এ দিনে তাদের প্রভুর নির্দেশ পালনে আনন্দ পায় তাই ঈদ নামে এর নামকরণ করা হয়েছে। রমযানের একমাস দিনের বেলা পানাহার নিষিদ্ধের পর সদকায়ে ফিতর (ঈদুল ফিত্র) এবং ঈদুল আযহায় হজ্ব-যিয়ারত, কুরবানির গোশত ইত্যাদি ফিরে পাওয়ার পর আনন্দ উপভোগ স্বাভাবিক। ঈদের বহুবিদ অর্থ থাকলেও আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ ঈদ অর্থে খুশিই বুঝে থাকেন। এ খুশির ঈদ আমাদের মাঝে আসে বছরে দু’বার- একটি ঈদুল ফিতর অন্যটি ঈদুল আযহার মাধ্যমে।
কুরআনে হজ্ব ও কুরবানি : ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির অন্যতম একটি হলো হজ্ব¡। হিজরী সালের ১২তম মাস (চান্দ্র মাস) জিলহজ্বের নয় তারিখে হজ্ব সম্পন্ন হয়। এর পরের দিন দশ জিলহজ্ব তারিখে কুরবানি অনুষ্ঠিত হয়। এ কুরবানি জ্বিলহজ্ব মাসের দশ থেকে বার তারিখ পর্যন্ত যে কোন দিন করা যায়। তবে প্রথম দিন অর্থাৎ দশ জিলহজ্ব করাই উত্তম। হজ্বের সাথে কুরবানির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। আরবী ‘কুরবত’ শব্দ থেকে ‘কুরবানি’ শব্দের উৎপত্তি। কুরবত অর্থ নৈকট্য। কুরবানির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হলো- আল্লাহ দেখতে চেয়েছিলেন- ইবরাহীম আ.-এর নিকট তাঁর ঐশী নির্দেশ বড় নাকি প্রাণাধিক পুত্রের মমতা। ত্যাগের এ ইস্পাত কঠিন পরীক্ষা নেয়ার জন্য আল্লাহ তা’আলা ইবরাহীম আ.-এর প্রিয় পুত্রকে তাঁর নামে যবাইয়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে কালামে পাকের ৩৭ নং সূরা সাফ্ফাত-এর ১০২-১০৮ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন : “অতঃপর সে যখন তার পিতার সাথে কাজ করার মতো বয়সে উপনীত হলো তখন ইব্রাহীম বলল, ‘বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবাই করছি, এখন তোমার অভিমত কী বলো? সে বলল, আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।’ যখন তারা আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইব্রাহীম তাঁর পুত্রকে কাত করে শোয়ালেন, তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললাম, ‘হে ইব্রাহীম! তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করলে।’ এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান কুরবানির বিনিময়ে আমি এটা পরবর্তীদের জন্য অনুসরণীয় করে রেখেছি।”
কুরবানির তাৎপর্য : নিয়তের পবিত্রতা ও দৃঢ়তার ওপর মূলত কুরবানি কবুল হওয়া নির্ভর করে। প্রাক ইসলামী যুগে কুরবানি করার পর কুরবানির পশুর গোশ্ত আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদনের জন্য মানুষ কা’বা ঘরের সামনে রেখে দিতো এবং পশুর রক্ত কা’বার দেয়ালে লেপটে দিতো। এ কু-প্রথার মূল্যোৎপাটনের জন্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কালামে পাকের ২২ নং সূরা হজ্ব-এর ৩৭ নং আয়াতে ঘোষণা করেছেন : “আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” কুরবানির সময় কুরআনের ৬ নং সূরা আনআম-এর যে ১৬২-১৬৩ নং আয়াতদ্বয় উচ্চারণ করা হয় তাতে বলা হয়েছে : “বলো, আমার নামায, আমার ইবাদত (কুরবানি), আমার জীবন ও মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমিই প্রথম মুসলিম।” এ আয়াতে কারীমার তাৎপর্য হচ্ছে- একজন প্রকৃত মুসলিম জীবনের চলার পথে আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা যতোই কঠিন হোক না কেন তা সানন্দচিত্তে মেনে নেয়ার জন্যে তৈরি থাকবে এবং যা তিনি নিষেধ করেছেন তা যতোই মোহনীয় ও কমনীয় হোক না কেন তা পরিহারে বদ্ধপরিকর হবে। এ রকম প্রত্যয়দীপ্ত মুসলিমের ব্যাপারে কালামে পাকের সূরা বাকারার ২৮৫ নং আয়াতের অংশবিশেষে বলা হয়েছে : “আর তারা বলে আমরা শুনেছি এবং পালন করেছি (বা মেনে নিয়েছি)।” এটিই হচ্ছে কুরবানির আসল তাৎপর্য। কুরবানি সম্পর্কে কুরআনের এ মূল তাৎপর্য অনুধাবন এবং উপলব্ধি ছাড়া যে কুরবানি তা শুধু গোশত ভক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
যুগে যুগে কুরবানি : কুরবানি নতুন কোনো বিষয় নয়। এ ব্যাপারে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কালামেপাকের ২২ নং সূরা হজ্ব-এর ৩৪-৩৫ নং আয়াতে কারীমায় ঘোষণা করেছেন : “আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি যাতে আমি তাদেরকে জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলোর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের ইলাহ্ এক, সুতরাং তাঁরই নিকট আত্মসমর্পণ করো এবং সুসংবাদ দাও বিনীতগণকে যাদের হৃদয় ভয়ে কম্পিত হয় আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে।” উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ে অতি সহজেই অনুমেয় প্রত্যেক সম্প্রদায়ের প্রতি কোনো না কোনো ফরমে কুরবানি ফরয ছিলো।
হাদীসে রাসূলের আয়নায় কুরবানি : ১. “যায়েদ ইবনে আকরাম রা. থেকে বর্ণিত : তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ স.কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! কুরবানি কী?’ নবী করীম স. বললেন : তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের সুন্নাত।’ অত:পর বললাম, ‘এটা করলে আমরা কী পাবো?’ তিনি বললেন, ‘প্রত্যেকটি চুলের বিনিময়ে একটি করে নেকী।’ অত:পর জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! পশমের ব্যাপারে কী হবে?’ তিনি বললেন, ‘প্রতিটি পশমের বদলে একটি করে নেকী পাওয়া যাবে।” (ইবনে মাজাহ, হাকেম, আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ, আল-মুনযেরী)।
ইবরাহীম আ.-এর কুরবানি : কুরবানির ক্ষেত্রে তাকওয়ার সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইব্রাহীম আ., তাঁর পুত্র ইসমাইল আ. এবং তাঁর স্ত্রী হাজেরা আ.। সম্রাট নমরুদ ইবরাহীম আ.কে অগ্নিকু-ে নিক্ষেপের সময় আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসের কারণে গায়রুল্লাহর সাহায্য গ্রহণ করেননি। অবশেষে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর বিশ্বাসের ফলস্বরূপ আগুনকে নির্দেশ দিলেন : “কুনি বারদাঁও ওয়াস্সালামুন আলা ইবরাহীম।” যার ফলশ্রুতিতে ইবরাহীম আ.-এর প্রতি আগুন দহনশক্তিহীন হয়ে নাতিশীতোষ্ণে পরিণত হয়েছে।
হযরত ইবরাহীম আ. মানব মনের দুর্বলতার উৎস শিরক তথা গায়রুল্লাহর শক্তিমত্তার উপর মানুষের আস্থার মূলে কুঠারাঘাত হেনেছিলেন এবং এই শক্তির মূল আধার আল্লাহর ওয়াহদানিয়াতকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন নিজ সমাজে। কারণ আল্লাহর ওয়াহদানিয়াতের ওপর আস্থাই মানুষকে দুর্জয় শক্তির অধিকারী করতে পারে এবং মানব সমাজে তাওহিদী ঐক্যই আনতে পারে শান্তি, সাম্য, সহমর্মিতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার।

     এ ক্যটাগরীর আরো সংবাদ