,

শিরোনাম :
আশুগঞ্জে সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম ও মাংস বিক্রি করছে প্রাণিসম্পদ দপ্তর হেফাজতের উপর ভর করে হামলা করেছে বিএনপি-জামাত ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের মানববন্ধন, হেফাজতের সকল সংবাদ বর্জনের ঘোষণা  আশুগঞ্জে হরতালে সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করলেন শিউলি আজাদ এমপি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হরতাল : সংঘর্ষ, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ, নিহত আরো ৪ স্বেচ্ছায় রক্তদানে সকলকে উৎসাহী করে তুলতে হবে : অরবিন্দ বিশ্বাস চট্টগ্রাম বিভাগীয় জয়িতা নির্বাচিত হওয়ায় নিশাত সুলতানাকে সংবর্ধনা দিল ‘আশার আলো’ আশুগঞ্জে ১শ ১০ পাউন্ডের বিশাল কেক কেটে বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী পালন মেঘনা নদী দখল করে এপিসিএল এর বালু ভরাটের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন সায়েদুল হক মাস্টারের ইন্তেকাল

মহান বিজয় দিবস : সময়ের ভাবনা

মহান বিজয় দিবস : সময়ের ভাবনা
মহিবুর রহিম

একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের অসামান্য কাব্যিক রূপ দিয়েছেন বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার কবি শামসুর রাহমান। তাঁর সেই বিখ্যাত কবিতা ‘ তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’, যার প্রতি ছত্রে ফুটে উঠেছে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও যুদ্ধের ভয়াবতা। কবির ভাষায়-

‘তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
সাকিনা বিবির কপাল ভাঙল,
সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এল
দানবের মতো চিৎকার করতে করতে
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
ছাত্রাবাস বস্তি উজাড় হলো
রিকয়েললেস রাইফেল আর মেশিনগান খই ফোটাল যত্রতত্র
তুমি আসবে বলে, ছাঁই হলো গ্রামের পর গ্রাম
তুমি আসবে বলে,
বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভুর বাস্তুভিটার ভগ্নস্তুপে দাঁড়িয়ে
একটানা আর্তনাদ করল একটা কুকুর
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের উপর’

সেই মহান মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মাস ডিসেম্বর।নিজস্ব মানচিত্র ও নিজস্ব পতাকা অর্জনের মাধ্যমে বাঙালি জাতি সদর্পে বিশ্বের  বুকে জানান দেয় তার একটি স্বতন্ত্র স্বকীয় সত্তা আছে। সেই সত্তা হাজার বছরের উজ্জ্বল ইতিহাসকে ধারণ করে আছে।
দীর্ঘ বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের পর ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি দেশ স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু বাঙালি জাতির মুক্তি তাতে আসেনি। বরং বাঙালির উপর নেমে আসেন পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ। ফলে পাকিস্তানের শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধেও বাঙালি জাতিকে দীর্ঘ ২৪ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলন চালাতে হয়। সেই দুর্দিনের অমানিশা পার হয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। পাকিস্তানি অপশাসন, শোষণ, নির্যাতন ও বৈষম্যের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য বাঙালি মরণপণ সংগ্রাম করে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভ করে। যার মাধ্যমে রচিত হয় বিজয়ের এক অসামান্য অমরকাব্য।
এ দিনেই বাঙালি জাতি অর্জন করে তার কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ও নিজস্ব লালসবুজের পতাকা। বিশ্বেও মানচিত্রে স্থান পায় বাংলাদেশ নামের নতুন একটি দেশ। তাই এই বিজয় দিবস প্রতিটি বাঙালির জীবনে আসেন নতুন প্রেরণা নিয়ে। আজ থেকে ৪৯ বছর আগে ডিসেম্বরের এ দিনে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা চির স্বাধীনচেতা বাঙালির দেশপ্রেমের কাছে হার মানে।
১৯৭১ সালে মুক্তিবাহিনীর মরণপণ লড়াই ইতিহাসের এক বিস্ময়। মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি অধ্যায়ে রচিত হয়েছে হাজারো মহাকাব্য। তার কতটুকুই বা হয়েছে লিপিবদ্ধ? দীর্ঘ ব্রটিশ শাসন শোষণে এ জাতির মেরুদন্ড প্রায় ভেঙে পড়েছিল। সেই দুর্দিন পেরিয়ে বাঙালি জাতি আবার পাকিস্তানিদের দুঃশাসনের কবলে পড়ে। আবার শুরু হয় আন্দোলন সংগ্রাম। ইতিহাসের ক্রান্তিকাল পেরিয়ে বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। এরই প্রস্তুতিলগ্নে ঐতিহাসিক ছয়দফা আন্দোলনে নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বঙ্গবন্ধু ও তার ঘনিষ্ঠসহযোগী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ। অবিসংবাদিত নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীও সেই সংকটকালে সবসময় সংগ্রামে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন, তারপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ-বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। আর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুররহমানের ছিল অসামাণ্য ভূমিকা। বাঙালি জাতির নিজস্ব পরিচয় ও ঠিকানা খুঁজতে নিজেকে উৎসর্গ কওে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশ মাতৃকার জন্য নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও অর্জন করতে চেয়েছেন একটি সার্বভৌমভূখন্ড। বঙ্গবন্ধুই একমাত্র নেতা যিনি বাঙালির আবেগ, আকাক্সক্ষা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং বীরের মতো জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তার বজ্রকণ্ঠকে কোনোভাবেই স্তব্ধ করতে পারেনি। তিনি গড়ে তুলেছিলেন ঐক্যবদ্ধ জাতীয় সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলনের পথ ধওে গণতন্ত্র ও বাঙালির আজন্ম লালিত অধিকার আদায়ের দাবিতে ৬ দফা, ৭০ এরনির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় ও শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি, সামরিক জান্তার নিষ্পেষণ, হত্যা, নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতির ম্যান্ডেট নিয়ে একাত্তরের অগ্নিঝরা ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার যে উদাত্ত আহ্বান বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল- তা আজও জাতির ধমনিতে শিরহরণ জাগায়। সেদিনই বাঙালির বুকে স্বাধীনতার বীজমন্ত্রটি রোপিত হয়েছিল। একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কারান্তরীণ রেখে এ জাতির কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছিল। ওরা ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুকে কারাবন্দি করলে বাঙালি নেতৃত্বহীন হয়ে পড়বে। তারপর হত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে বাঙালিকে দমন করা যাবে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। মরণপণ লড়াই করে গোটা বাঙালি জাতি ইতিহাস সৃষ্টি করে। মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানের নিয়মিত ও সুপ্রশিক্ষিত বাহিনীকে পযুদস্তু করে কাঙ্ক্ষিত বিজয় ছিনিয়ে আনে।
১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ করেছিল পাকিস্তানিবাহিনী। চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে ছিল বাঙালির ভাষা ভিত্তিক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের। বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে দেখেছিল সে ঘটনাক্রম। চির অবহেলিত বাঙালির এক অসামাণ্য বিজয়। হাজার বছরের এক শ্রেষ্ঠতম স্মরণীয় ঘটনা। আমরা জানি বিজয়ের অনুভূতি সবসময়ই আনন্দের হয়। কিন্তু বাঙালির বিজয় তেমন আনন্দের ছিলনা। ত্রিশ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগ আর অগণিতমা- বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা পেয়েছিলাম স্বাধীনতা। তাই আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণকরি সেই মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আর যেসব মা- বোন ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তাদের।
পৃথিবীর বহু দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তিলাভ করেছে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ আলোচনার মাধ্যমে, বিনা রক্তপাতে। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে লাখো প্রাণের বিনিময়ে। তাই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ঐক্যবদ্ধ করেছিল এক অভিন্ন লক্ষ্যে। আমাদের ঐক্য ও সংহতির পেছনে ছিল সুদীর্ঘকালের লালিত স্বপ্ন স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। আমরা এমন এক স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যার শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি হবে গণতান্ত্রিক; যে রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত হবে; অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও সব ধরণের বৈষম্যেও অবসান ঘটবে। এক ন্যায়সঙ্গত সমাজগড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিল গোটা বাঙালিজাতি, যেখানে সবার অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে আর বহুকালের কুসংস্কার, অশিক্ষার অন্ধকার দূর হবে। বাংলাদেশ হবে সুখী, সৌহার্দ্যময়, সমৃদ্ধ এক জন্মভূমি। এমনটাই ছিল এদেশের আপামর মুক্তিকামী মানুষের স্বপ্ন। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু সেই স্বপ্নই দেখিয়েছিলেন জাতিকে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতার পর বাঙালি জাতি সেই ঐক্য ধওে রাখতে পারেনি। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক বিভক্তি দেশে গণতন্ত্রেও চর্চাকে ব্যহত করেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘটেছে অনাকাঙ্ক্ষিত উত্থান-পতন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যাছিল এদেশের রাজনীতিতে এক মর্মান্তিক কালো অধ্যায়। যা এ জাতিকে স্তব্দকরে দিয়েছিল। প্রতি বছর বিজয় দিবস আমাদের পেছনে তাকাতে বাধ্য করে। নতুন কওে হিসেব মেলাতে তাকিদ দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন পূরণের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দুর্নীতি ও অপশাসনের থেকে মুক্তি পেতে প্রেরণা যোগায়। যা ছিল বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের মূল চেতনা।
আমাদের সামনে সম্ভাবনা অসীম। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সব সমস্যা মোকাবেলায় সচেষ্ট হলে আমাদের অগ্রগতি কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবেনা। বিভেদ ভুলে আমরা সে পথেই অগ্রসর হব- এই হোক আমাদের বিজয় দিবসের অঙ্গীকার।
মহিবুর রহিম : কবি ও প্রাবন্ধিক।

     এ ক্যটাগরীর আরো সংবাদ